মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় নতুন এক প্রযুক্তিগত প্রশ্ন সামনে এসেছে। শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ইসরাইলের ভূখণ্ডে আঘাত হানছে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে চলছে জোর আলোচনা। অনেকের ধারণা, এর পেছনে থাকতে পারে চীনের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম বেইদৌ (BeiDou)।
বহু স্তরের প্রতিরক্ষা পেরিয়েও আঘাত
ইসরাইলের দিকে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রকে থামাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি সক্রিয় থাকে। ইরাক, সিরিয়া, জর্ডানসহ আশপাশের দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় মিসাইল বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করে মার্কিন নৌবহরও প্রতিরোধে অংশ নেয়।
এরপরও যদি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের আকাশসীমায় প্রবেশ করতে পারে, সেখানে রয়েছে বহুল আলোচিত Iron Dome সহ পাঁচ স্তরের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু এতসব প্রতিরোধ সত্ত্বেও কিছু ইরানি মিসাইল লক্ষ্যভেদে সফল হওয়ার খবর সামনে আসছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে এত নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ সম্ভব হচ্ছে।
বেইদৌ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
বেইদৌ হলো চীনের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের GPS–এর বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। ২০২০ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping বেইজিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিস্টেমের পূর্ণ কার্যক্রম চালু করেন।
এই প্রকল্পের পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। ১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের সময় চীন উপলব্ধি করে যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি জিপিএস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, তাহলে তাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই চীন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা তৈরি করে।
বেশি স্যাটেলাইট, বেশি নির্ভুলতা
বিশ্লেষকদের মতে, বেইদৌ সিস্টেমের একটি বড় শক্তি হলো এর স্যাটেলাইট সংখ্যা। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস নেটওয়ার্কে প্রায় ২৪টি সক্রিয় স্যাটেলাইট রয়েছে, সেখানে বেইদৌ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ৪৫টি স্যাটেলাইট। এই অতিরিক্ত কভারেজ পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে অবস্থান নির্ধারণকে আরও নির্ভুল করে তোলে।
শুধু অবস্থান নির্ধারণই নয়, বেইদৌতে রয়েছে তথ্য আদানপ্রদান ও যোগাযোগের অতিরিক্ত সুবিধাও। ফলে সামরিক ক্ষেত্রে এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরান কি সত্যিই বেইদৌ ব্যবহার করছে?
এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বলেনি যে তারা বেইদৌ ব্যবহার করছে। তবে দেশটির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়েছিল, তারা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন উৎস থেকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং কোনো একক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে না।
এই বক্তব্য থেকেই অনেক বিশ্লেষক ধারণা করছেন, ইরান হয়তো একাধিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহার করছে, যার মধ্যে বেইদৌও থাকতে পারে।
কেন এটি সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, বেইদৌ ব্যবহারের ফলে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য নির্ধারণ অনেক বেশি নিখুঁত হতে পারে। এই সিস্টেমের ত্রুটির সীমা এক মিটারেরও কম বলে ধারণা করা হয়। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে আঘাত করতে পারে।
এছাড়া লক্ষ্যবস্তু মাঝপথে পরিবর্তন হলেও সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দিক সংশোধন করতে পারে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি পশ্চিমা জ্যামিং প্রযুক্তি এড়িয়ে যেতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম।
বেইদৌতে শর্ট মেসেজ কমিউনিকেশন সুবিধাও রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরে থাকা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব, এমনকি মাঝপথে লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তনের নির্দেশও পাঠানো যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ভান্ডার মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড়গুলোর একটি বলে মনে করা হয়। এই মিসাইলগুলোর পাল্লা কয়েকশ কিলোমিটার থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো মোবাইল লঞ্চারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রাখা হয়, যার ফলে সেগুলো শনাক্ত বা ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু মিসাইল বা বিমান হামলার লড়াই নয়। এটি প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, সাইবার ও তথ্যযুদ্ধের সমন্বিত প্রতিযোগিতা।
যদি সত্যিই ইরান চীনের বেইদৌ সিস্টেম ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস নির্ভর সামরিক আধিপত্যের জন্যও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন কেবল আঞ্চলিক শক্তির লড়াই নয়—এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

0 মন্তব্যসমূহ