যে হামলার মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে থামিয়ে দেওয়ার বার্তা দিতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, এক বছর পর সেই হামলারই অবিস্ফোরিত বোমা ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা। তেহরানের দাবি, ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকা মার্কিন বাংকার বাস্টার বোমাই এখন শক্তির সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
গত জুনে ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইরানের একাধিক পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এক বছর পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বিস্ফোরক দাবি তুলেছেন। তিনি জানান, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্থাপনায় এখনো অবিস্ফোরিত বোমা পড়ে আছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
কোন কোন স্থাপনা ঝুঁকিতে?
ইরানের দাবি অনুযায়ী, নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা, ফোরদো জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্র—এই তিনটি স্পর্শকাতর স্থাপনায় অবিস্ফোরিত বোমা থাকতে পারে। এসব স্থাপনা ইরানের পরমাণু কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
ইরানের ইয়ং জার্নালিস্ট ক্লাব নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া বক্তব্যে আরাকচি বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি-র সঙ্গে তিনি সরাসরি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পরিদর্শনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রোটোকল আছে কি না জানতে চাইলে গ্রসি নাকি জানিয়েছেন, এমন কোনো স্পষ্ট প্রোটোকল নেই।
পরিদর্শন নিয়ে তেহরানের শর্ত
তেহরান বলছে, অবিস্ফোরিত বোমা ও অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আগে একটি সমঝোতা ও নিরাপত্তা প্রোটোকল তৈরি করতে হবে। এই শর্ত পূরণ না হলে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন সম্ভব নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ইরানের কূটনৈতিক চাপ তৈরির অংশও হতে পারে।
কৌশলগত ঝুঁকি কোথায়?
সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অবিস্ফোরিত বোমা ইরানের হাতে থাকলে তা “রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং”-এর সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, অস্ত্রটি কীভাবে কাজ করে, কোন উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে, কোথায় দুর্বলতা—এসব বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত বাংকার বাস্টার প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ভবিষ্যতে নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা বা অনুরূপ প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এটি কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরান তার মিত্রদের সঙ্গেও প্রযুক্তিগত তথ্য ভাগাভাগি করতে পারে—যা ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ধ্বংস থেকে নতুন বার্তা
ইরানের বার্তা স্পষ্ট—ভয় নয়, পরাজয় নয়; বরং যুদ্ধের ছাই থেকে নতুন সমীকরণ। যে হামলা তাদের পরমাণু সক্ষমতা থামাতে চেয়েছিল, সেই হামলার অবশিষ্টাংশই এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হতে পারে বলে দাবি তেহরানের।
তবে স্বাধীনভাবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিষয়টি কেবল সামরিক নয়; এটি কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবও ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে তাই এই অবিস্ফোরিত বোমা এখন নতুন এক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

0 মন্তব্যসমূহ