Hot Posts

6/recent/ticker-posts

"আমেরিকা ফার্স্ট” থেকে “আমেরিকা একা”? বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ

 


এক সময় বিশ্বে কোথাও যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে সবার দৃষ্টি যেত Washington-এর দিকে। যেন পুরো পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতেই। কিন্তু সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে—এবং এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে Donald Trump-এর পররাষ্ট্র নীতির।

ট্রাম্প বিশ্বাস করতেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্বের চেয়ে দর-কষাকষিই বেশি কার্যকর। তাই তিনি ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে আচরণ করেছেন ব্যবসায়ীর মতো, বন্ধুর মতো নয়। ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিজে বহন করতে বলেছিলেন, NATO-কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন আর্থিক হিসাবের কথা। এমনকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে Paris Climate Agreement থেকেও সরিয়ে নিয়েছিলেন, “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিকে সামনে রেখে।

বাহ্যিকভাবে এই অবস্থান শক্তিশালী মনে হলেও এর ভেতরে ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে দূরত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির মূল ছিল শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা নয়, বরং তার মিত্রজোট। London, Paris, Tokyo, Seoul—সবাই মিলে এক অদৃশ্য জোট তৈরি করেছিল, যার কেন্দ্রে ছিল ওয়াশিংটন।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সেই জোটে ফাটল দেখা দেয়। মিত্ররা সরাসরি বিরোধিতা না করলেও ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে শুরু করে। ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হয় সন্দেহ, আর এশিয়ার দেশগুলো প্রশ্ন তোলে—ওয়াশিংটন কি এখনও নির্ভরযোগ্য?

এই শূন্যস্থানই কাজে লাগায় China। কোনো উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা ছাড়াই চীন ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বাড়াতে থাকে। যখন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে, তখন অনেক দেশ বিকল্প বাজার খুঁজতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে আমেরিকার দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে চীনের উপস্থিতি শক্তিশালী হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলো প্রায়ই যুদ্ধ দিয়ে নয়, বরং বিশ্বাসের পরিবর্তন দিয়ে ঘটে। আর এখানেই বড় ধাক্কা খেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একসময় যে বিশ্বায়নের পথ তারা তৈরি করেছিল, এখন সেই পথেই এগোচ্ছে চীন—আফ্রিকার বন্দর, এশিয়ার রেললাইন, ইউরোপের বিনিয়োগে ক্রমশ বাড়ছে তাদের প্রভাব।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল US Dollar। কিন্তু এখন কিছু দেশ বিকল্প হিসেবে Chinese Yuan ব্যবহার শুরু করেছে। বিশেষ করে Iran ও Russia ইতোমধ্যেই সেই পথে এগোচ্ছে। এটি ধীরে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, কারণ মুদ্রা মানেই শুধু অর্থ নয়—ক্ষমতা।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যেও দেখা যাচ্ছে নতুন বাস্তবতা। যেখানে আগে বিভাজন ও সংঘাত ছিল নিয়ম, এখন সেখানে তৈরি হচ্ছে আঞ্চলিক সমঝোতা। দেশগুলো নিজেরাই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে এর মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি শেষ হয়ে গেছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা ও সামরিক সক্ষমতায় তারা এখনও শীর্ষে। বড় বড় কোম্পানি এখনো সেখানে বিনিয়োগ করছে, অর্থনীতিও শক্তিশালী। কিন্তু সমস্যা একটাই—বিশ্বাস।

বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির পাশাপাশি বিশ্বাস সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই বিশ্বাসই এখন প্রশ্নের মুখে। মিত্ররা যদি মনে করে তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, তাহলে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে—এবং একবার ভেঙে গেলে সেই বিশ্বাস পুনর্গঠন করা কঠিন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে নিজস্ব অবস্থানে অনড় থেকে ধীরে ধীরে আরও একা হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে কৌশল পরিবর্তন করে মিত্রদের আবার কাছে টানা এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে বৈশ্বিক শক্তির কাঠামোতে। একসময়ের একমেরু বিশ্ব এখন বহুমেরুতে রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। এতে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি নতুন ভারসাম্যের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব কি নতুন এক ঠান্ডা যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে, নাকি একাধিক শক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠবে নতুন ভারসাম্য?

উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বিশ্ব বদলাচ্ছে, ধীরে হলেও স্থায়ীভাবে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি চিরন্তন সত্য: কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়।

“আমেরিকা ফার্স্ট”—এই স্লোগান থেকেই কি শুরু হলো “আমেরিকা একা”র গল্প? সময়ই দেবে তার উত্তর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ