যেখানে তেলের খনি, সেখানে সংঘাত—এই কথাটি বহুবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। তাই এই অঞ্চলে যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমান সংঘাত অনেক দিক থেকেই আলাদা। কারণ এটি কেবল দুই দেশের যুদ্ধ নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত সংঘর্ষ, যেখানে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি United States এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রতিরোধী রাষ্ট্র Iran।
যুদ্ধের শুরুতে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন সংঘাতটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থার কারণে Israel ও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে—এমনটাই ধারণা ছিল অনেকের। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে যুদ্ধ থামানোর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে ইরান যেন উল্টো কৌশল নিয়েছে—যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার।
সংঘাতের পেছনের কৌশল
দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইল মনে করে আসছে যে ইরানের সামরিক শক্তি এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এই কারণেই গত দুই দশকে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা Mossad বিভিন্ন উপায়ে ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের ভেতর থেকেই দুর্বলতা তৈরি করা। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ ছিল, সেটি শেষ করা এখন ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান দ্রুত পাল্টা হামলা শুরু করে। শুধু ইসরাইল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ Islamic Revolutionary Guard Corps জানিয়েছে তারা একাধিক ধাপে প্রতিশোধমূলক হামলা পরিচালনা করছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর এসেছে Strait of Hormuz এর আশেপাশে, Bahrain-এর Mina Salman Port এলাকায় এবং United Arab Emirates-এর Dubai International Airport সংলগ্ন অঞ্চলেও।
এসব হামলা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিচ্ছে—ইরান এই যুদ্ধকে শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে সংঘর্ষ হিসেবে দেখছে।
কেন দীর্ঘ যুদ্ধ চায় ইরান
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল খুবই স্পষ্ট। তারা দ্রুত জয় চায় না। বরং যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে শক্তিশালী এবং স্থায়ী ফল অর্জন করতে চায়।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়:
১. ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে রাখা।
২. আঞ্চলিক মিত্রদের ব্যবহার করে সামরিক চাপ ছড়িয়ে দেওয়া।
৩. ফিলিস্তিন ইস্যুকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করেছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন যুদ্ধের চাপ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে জনগণ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে।
‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল
ইরানের সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যাকে বলা হয় মোজাইক ডিফেন্স। এই ব্যবস্থায় যদি কেন্দ্রীয় কমান্ড ধ্বংস হয়ে যায় বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবুও যুদ্ধ থেমে যাবে না।
স্থানীয় কমান্ডারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা নিজেদের অবস্থান থেকে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে। এর লক্ষ্য দ্রুত বিজয় নয়; বরং প্রতিপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্ত করে তোলা।
আধুনিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক বাস্তবতা
এই যুদ্ধ আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এনেছে। আধুনিক যুদ্ধ শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সামর্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরানের তৈরি শাহেদ সিরিজের ড্রোনের দাম কয়েক হাজার ডলার। কিন্তু এগুলো প্রতিহত করতে প্রতিপক্ষকে ব্যবহার করতে হচ্ছে কয়েক মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য যুদ্ধের সমীকরণকে বদলে দিচ্ছে।
ইসরাইলের সাবেক সামরিক কমান্ডার Isaac Brick বলেছেন, ইসরাইল অত্যাধুনিক বিমান বাহিনীর ওপর অনেক বেশি নির্ভর করেছে। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ জিততে হলে বিমান, স্থল ও নৌবাহিনীর সমন্বিত অভিযান দরকার।
আর ইরানের মতো বড় ও দুর্গম ভূখণ্ডে স্থলবাহিনী পাঠানো প্রায় অসম্ভব—যা ইসরাইলের জন্য বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও কঠিন শর্ত
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump পরিস্থিতি শান্ত করতে Vladimir Putin-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন।
তবে যুদ্ধ থামাতে ইরান যে শর্তগুলো দিয়েছে সেগুলো বেশ কঠিন:
- ইরানের কৌশলগত অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
- হামলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- ভবিষ্যতে আর হামলা হবে না—এমন আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এতে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রভাবও কমে যেতে পারে এবং Palestine ইস্যুতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতা
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই দ্রুত শেষ করা সম্ভব? নাকি এটি ধীরে ধীরে এমন এক দীর্ঘ সংঘাতে পরিণত হবে যেখানে জয়–পরাজয়ের হিসাব বদলে যাবে?
যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল শক্তির প্রদর্শন দিয়ে, সেটি এখন কৌশল ও ধৈর্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আর তাই অনেকেই আজ একটি কথাই বলছেন—
যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু শেষ করা সবসময়ই সবচেয়ে কঠিন।

0 মন্তব্যসমূহ